কিভাবে একটি সুশৃঙ্খল আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিলো
- ৩০ জুলাই ২০২৪, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩১, ২৩ মহররম ১৪৪৬
- ড. এ কে এম মাকসুদুল হক
গত পয়লা জুলাই থেকে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবিতে ছাত্ররা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু সরকার অদূরদর্শিতার সাথে শক্তি দিয়ে আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে দুই শতাধিক ছাত্র-জনতা প্রাণ হারান। আহত হয়েছেন আরো কয়েক হাজার। একই সাথে হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এ আন্দোলনের ঘটনা পরিক্রমার একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ দরকার। আন্দোলনটিকে মোটামুটিভাবে তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়।
প্রথম ধাপ : প্রথমত ১ জুলাই ছাত্ররা সরকারের কাছে দাবি উত্থাপন করে সমাধানের অনুরোধ করে ৪ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। অন্যথায় আন্দোলনের হুমকি দেয়। এ সময় তারা মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যে তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখেন। সরকার কর্ণপাত না করলে আন্দোলনকারীরা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে অবস্থান কর্মসূচি করে কয়েক ঘণ্টা ধরে রাস্তাঘাট বন্ধ রাখেন। এতে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। দেশবাসী আন্দোলনের উত্তাপ পেতে থাকে। কিন্তু সরকার এটি তো আমলে নেয়নি; বরং বিভিন্ন ধরনের তির্যক মন্তব্য করতে থাকেন অনেক নেতা। আর কয়েকজন মন্ত্রী এটিকে হাইকোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন বলে হুমকি দেন। ফলে ছাত্রদের আন্দোলন নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। ৫ জুলাই থেকে তারা বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। ৭ জুলাই থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ‘বাংলা ব্লকেড’ শুরু হয়। ৯ জুলাই তারা সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। পুলিশ একটু একটু করে শক্ত অবস্থানে যেতে থাকে। এর মধ্যে গত ১৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন
দ্বিতীয় ধাপ : এ পর্যায়ে এসে স্বাভাবিক গতিতে চলা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠে। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর চীন ফেরত সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিকের একটি লিডিং প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই প্রশ্ন কতটুকু প্রাসঙ্গিক ছিল বা কি উদ্দেশ্যে করা হয় সেই বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, এটি আন্দোলনকে বেগবান করে। প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন- তবে কি ‘রাজাকারের’ নাতিরা চাকরি পাবে? ‘রাজাকার’ শব্দটি আমাদের দেশে অত্যন্ত অপমানজনক। কাজেই ‘শব্দটিকে’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিতে পারেননি। ফলে এটি আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো কাজ করে। ওই রাতে (১৪ জুলাই) ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্রছাত্রীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করেন। তারা স্লোগান দেন- ‘তুমি কে আমি কে : রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, সরকার সরকার।’
‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে তারা রাতভর প্রতিবাদ জানান। কিন্তু এ স্লোগান খণ্ডিত করে অপবাদ দেয়া হয় যে, ‘শিক্ষার্থীরা নিজেদের রাজাকার পরিচয় দিয়েছেন।’ এ বিষয়টি রাজনীতিকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়। এক শ্রেণীর মিডিয়া এ অপপ্রচারে যোগ দেয়। অন্য দিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ‘রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন’, এ অজুহাত তুলে তাদের শায়েস্তা করার জন্য ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়া হয়। এমনকি সরকারের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন- এদের দমনের জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। ক্ষমতার দাপটে টগবগ করা ছাত্রলীগ এতে হুঙ্কার দিয়ে উঠে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। আহত শিক্ষার্থীদের ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসারত অবস্থায়ও হামলা করে। এমনকি অসংখ্য ছাত্রীকে লাঠি-হকিস্টিক হাতে পেটাতে দেখা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ফলে ১৫ জুলাই দেশব্যাপী সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেন।



